গরিবের বাড়ি ছাড়বে কবে চসিক


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১, ৮:১১ পূর্বাহ্ন /
গরিবের বাড়ি ছাড়বে কবে চসিক

ওয়াসিম আহমেদ

১১ বছর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) জন্য যুগোপযোগী ‘নগর ভবন’ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নানা জটিলতায় মহিউদ্দীন চৌধুরীর পরের দুই মেয়রও ভবনটি করতে পারেননি। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত স্থানে কখনও ভবনের পাইলিং, গাড়ির পার্কিং এবং সর্বশেষ জায়গাটিতে সবজির চাষ করেছেন নিরপত্তায় নিয়োজিত কর্মীরা। আন্দরকিল্লাস্থ চসিকের কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়েছে টাইগারপাসে বস্তিবাসীদের জন্য নির্মিত সাততলা ভবনে। পুরাতন ভবনটি ভাঙার দরপত্র আহব্বান করেও আঞ্চলিক কার্যালয়, জনসংযোগ শাখা, মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহার করছে চসিক।
অন্যদিকে সময়ের ব্যবধানে ভবনটির নির্মাণ ব্যয় ৪৬ কোটি টাকা থেকে ২২৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভ্যাটিং (প্রকল্প ব্যয় যাচাই) শেষ হলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) সভায় উঠবে প্রকল্পটি। কাগুজে জটিলতায় ঝুলে থাকা প্রকল্পের কারণে প্রশ্ন উঠছে গরীবদের ঘর থেকে আদৌ নগর ভবনে ফিরতে পারবে কি সিটি করপোরেশন?
এমন প্রশ্নের জবাবে সিটি মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী পূর্বদেশকে জানান, টাইগারপাসের ভবনটি সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। নগর ভবন প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ার পর আন্দরকিল্লায় নির্ধারিত স্থানে নির্মিত হবে। সবধরনের কাজ শেষ হলে চসিকের প্রধান কার্যালয় সেখানে স্থানান্তর হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে ব্যবহৃত ভবনটি কি করা হবে তা অগ্রিম বলা কঠিন। তবে বস্তিবাসীকে পুনর্বাসন করার জন্য ইতোমধ্যে আমি চিন্তা করেছি। আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউএনডিপি’র (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি) প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তাদের কাছে আমি প্রস্তাব করেছিলাম বস্তিবাসীদের জন্য কিছু ভবন করে দিতে। এতে তারা রাজি হয়ে করপোরেশনকে পত্র দিয়েছেন। প্রদেয় জায়গার উপর কয়েকটি পাঁচ তলা ভবন করবে। সেখানে অন্তত দুইশ পরিবারকে পুর্নবাসন করা যাবে বলে জানান মেয়র রেজাউল।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে ভ্যাটিং (প্রকল্প ব্যয় যাচাই) করতে প্রকল্পটির প্রস্তাবনা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। সর্বশেষ গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আবারও ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ করার নির্দেশনা দেয়। সে অনুসারে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে সিটি করপোরেশন। সে ধাপ পার হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উঠবে প্রকল্পটি। এ ছাড়া পুরাতন নগর ভবনটি ভাঙা হবে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে। এ জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভবন ভাঙার দরপত্র আহব্বান করে প্রতিষ্ঠানটি।
গতকাল আন্দরকিল্লাস্থ নগর ভবনের জন্য প্রস্তাবিত স্থানটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালি পড়ে থাকা জায়গায় সবজির চাষ করেছেন নিরাপত্তা প্রহরীরা। রাখা হয়েছে বর্জ্য সংগ্রহের ভ্যান। মাঝের মুজিব বর্ষের ‘কাউন্ট ডাউন ক্লকটি’ ঝিমিয়ে পড়েছে। পাশের পুরাতন নগর ভবনের দ্বিতীয় তলায় আঞ্চলিক কার্যালয়-৬, নিচ তলা জনসংযোগ শাখার অফিস হিসেবে ব্যবহার করছে সংস্থাটি।
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৩ সালে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম পৌরসভা ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। ১৮৬৩ সালে একটি ও ১৯৬৪ সালে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হয়। এই দুটি ভবনেই করপোরেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপ‚র্ণ হয়ে পড়ায় ১৮৬৩ সালে নির্মিত ভবনটি ২০০৯ সালে ভেঙে ফেলা হয়। পাশের ছয়তলা ভবনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চলে আসছিল। সেটিও ব্যবহারের ‘অনুপযোগী’ হয়ে পড়ায় ২০১৯ সালের জুনের ২৩ তারিখ টাইগারপাসে অস্থায়ী কার্যালয় স্থানান্তর করেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। ২০১০ সালেল ১১ মার্চ ২০ তলা বিশিষ্ট নগর ভবনের নির্মাণকাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তখন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৬ কোটি টাকা। ওই বছরের ১৭ জুন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মোহাম্মদ মনজুর আলমের কাছে পরাজিত হন তিনি। তবে তখনও ভবনটি নির্মাণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছিল না। সাবেক মেয়র শেষ সময়ে এসে নগর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। চারমাস কাজ চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল আ জ ম নাছিরের কাছে নির্বাচনে হেরে যান তিনি। এরপর সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে ২০১৬ সালের ফেব্রæয়ারিতে ২৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ১শ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই ভবন করার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এতে সায় দেয়নি। ২০১৭ সালে আবার নগর ভবন, সেবক কলোনি ও বিভিন্ন সড়কের উন্নয়নে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয় সিটি করপোরেশন। ওই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে নগর ভবন নির্মাণ। ওই প্রকল্প থেকে নগর ভবন নির্মাণ আবারও বাদ দেয় মন্ত্রণালয়। পরে ভবনটি নির্মাণে ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চেয়ে ২০১৮ সালের আগস্টে তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে চিঠি দিয়েছিলেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। কিন্তু তাতেও বরাদ্দ মেলেনি। পরে আবার ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট ২০২ কোটি টাকার নগর ভবনের প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রকল্প ম‚ল্যায়ন কমিটির (আইপিইসি) সভায় উঠেছিল। সে সভা প্রস্তাবিত নগর ভবনে ‘অটোমেটেড’ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পনা সংশোধনের নির্দেশ দেয়। বর্তমানে দেশের সর্বাধুনিক ও ই-কন্ট্রোলিং সিস্টেম সুবিধাসম্পন্ন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে আরও ২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের ডিপিপি থেকে জানা যায়, ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৪ বর্গফুটের ২৩ তলা সিটি ভবনের ২ বেইজমেন্ট ও ফাউন্ডেশনসহ ২৩ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে ১১৮ কোটি ৮৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। ফার্নিচার সরবরাহসহ ইন্টেরিয়র কাজে ব্যয় ২৫ কোটি টাকা, ৬টি লিফট সরবরাহ ও স্থাপনে ৬ কোটি টাকা, ২০০টি এয়ারকুলার সরবরাহ ও স্থাপনে ২ কোটি টাকা, ১টি সাব-স্টেশন, জেনারেটর এবং সোলার প্যানেল সরবরাহ ও স্থাপনে ৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই প্রকল্পের ফিজিক্যাল কনটিনজেন্সির জন্য রাখা হয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা। যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১ দশমিক ৮৯৫ শতাংশ এবং প্রাইস কনটিনজেন্সির জন্য রাখা হয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮ হাজার টাকা। যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১ দশমিক ৮৯৫ শতাংশ।
উল্লেখ্য, টাইগারপাস এলাকার বাটালি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত অধিবাসীদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়ে ২০১৩ সালে বস্তিটি উচ্ছেদ করা হয়। পাঁচ বছর শেষে ১২ কাঠা আয়তনের নিজস্ব জায়গার ওপর প্রায় সাত কোটি টাকায় ভবনটি নির্মাণ করে সিটি করপোরেশন। সেখানে ২৫০ পরিবারকে পুনর্বাসন করার কথা ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৩ জনের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও হলফনামা নেয় সিটি করপোরেশন। তখন প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ধরা হয়েছিল ছয় লাখ টাকা। ফ্ল্যাটের জন্য এককালীন টোকেন মানি হিসেবে সিটি করপোরেশন নিয়েছিল ১০ হাজার টাকা। মাসিক আড়াই হাজার টাকা কিস্তিতে এ মূল্য পরিশোধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল সে সময় তাদের। পরে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে চসিক।

আপনি আমাদের কোন লিখা কপি করতে পারবেন না।