গ্রেনেড হামলা ও এক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশিত: ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২০

মোতাহার খান :

সেদিন ২১ আগষ্ট ২০০৪ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে আমি উপস্থিত থেকে পিছনে দাড়িয়ে বক্তব্য শুনছিলাম। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আকস্মিক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা, ভয়াবহ মৃত্যু ও দিনের আলো মুছে গিয়ে এক ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

চারিদিকে অন্ধকার।কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে,আমিও দৌড়াচ্ছি। কেউ বিভিন্ন দোকানে আশ্রয় নিচ্ছে কেউ মার্কেটে।দৌড়াতে দৌড়াতে আমিও স্টেডিয়াম মার্কেটের ভিতর ঢুকেছি।কেচি গেইট লাগিয়ে দিয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। অজস্র মানুষ ঢুকতে চাচ্ছে কিন্তু তাদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।মার্কেটের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম মানুষ কত অসহায়। বোমার শব্দ কালো ধুয়া,গাড়ি পুড়ানো, পুলিশের লাঠি চার্জ,ছুপছুপ রক্ত,বাতাসে পুড়ার গন্ধ,কতো মানুষের আহাজারি। কি হচ্ছিল কোন খবর পাচ্ছিলাম না,হঠাৎ খবর এল শেখ হাসিনা মারা গেছেন।তখন মার্কেট কর্তৃপক্ষ সবলোক মার্কেট থেকে বের করে দিচ্ছেন। বের হয়ে মহা বিপাকে পড়লাম। আমার সাথে ধনুয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ। সবাই দৌড়াচ্ছে আমরাও দৌড়াচ্ছি। বাহিরে এক রনক্ষেত্র।মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মনে হল এটাই যুদ্ধ। নিজেকে বাচানোর যুদ্ধ। কখনো ভাবিনি বেচে ফিরতে পারবো। অলি গলি দিয়ে দৌড়াচ্ছি। কোথাও গাড়ি পাচ্ছি না।অলিগলি দিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট দৌড়াইয়া অবশেষে মতিঝিল পৌছালাম। কোন গাড়ি নেই।হঠাৎ গাজীপুরগামী একটি বাস পেলাম। ছোট্ট বাসে এত লোক তিলঠাই নেই। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়েছি।গাড়ি চলছে শংকা নিয়ে। নিজের চোখে দেখছি আশেপাশের গাড়িগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। হয়তো যেকোনো সময় এই গাড়িটাও পুড়িয়ে দিবে ভয় আর শংকা নিয়েই এগুচ্ছি তবুও নামছি না।চারপাশে একই শব্দ শেখ হাসিনা মারা গেছে। মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম।এ কেমন দেশে বাস করি যে দেশে বঙ্গবন্ধুকে বাচতে দিলনা সেইদেশে শেখহাসিনার মতো অবিসংবাদিত নেতাকেও বাচতে দিলনা।আতংক নিয়েই টঙ্গী পর্যন্ত গাড়ি দিয়ে এসে বাকি পথ হেটে দৌড়ে এসেছি গাজীপুর পর্যন্ত। গাজীপুর এসে খবর পেলাম মারা গেছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমান।

শোকবিহ্বল জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আজ ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৬তম বার্ষিকী পার করছে। প্রায় দেড় দশক আগে ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা সেদিন অল্পের জন্য এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান ও অপর ২৪ জন এতে নিহত হন। এ ছাড়া এই হামলায় আরো ৪০০ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছে।
মেয়র হানিফের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপচার করার কথা থাকলেও গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে থাকার কারণে তাঁর অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে, শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন- আইভি রহমান, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।

মারাত্মক আহতরা হলেন শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, মোহাম্মদ হানিফ, সম্প্রতি প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, মাহবুবা পারভীন, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দীপ্তি, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ।এই নারকীয় হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

মোতাহার খান (শিক্ষক ও সাংবাদিক )
শ্রীপুর,গাজীপুর। ০১৭১৭৬৩৯৫৪৮
২১ আগষ্ট ২০২০