বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যা এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য জানায়। এই বৈশ্বিক চিত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে আত্মহত্যায় মৃত্যুর দিক থেকে পুরুষরা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বে পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি হয়ে থাকে, যেখানে প্রতি এক লাখে পুরুষদের মৃত্যু প্রায় ১২ জনের বেশি এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬ জনের কাছাকাছি।
এই পার্থক্যের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষরা সাধারণত তাদের মানসিক কষ্ট প্রকাশ করে না এবং সামাজিকভাবে তাদের উপর শক্ত থাকার চাপ থাকে। পরিবার চালানোর দায়িত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন তাদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে বউ-স্বামীর দ্বন্দ্ব, মা-বউয়ের সংঘাত, পারিবারিক অশান্তি এবং নিয়মিত মানসিক চাপ একজন পুরুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়, কিন্তু সেই কষ্ট তারা সহজে কাউকে বলতে পারে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও কম উদ্বেগজনক নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে এবং প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ এই পথ বেছে নেয়। তবে অনেক ঘটনাই সামাজিক লজ্জা ও আইনি জটিলতার কারণে প্রকাশ পায় না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে পুরুষ ও নারীর মধ্যে আত্মহত্যার হার নিয়ে মিশ্র চিত্র দেখা যায়, তবে সামগ্রিকভাবে পুরুষদের মৃত্যুহার বেশি হলেও নারীদের আত্মহত্যার চেষ্টা তুলনামূলক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
দেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সমস্যা, আর্থিক চাপ, সম্পর্ক ভাঙন এবং সামাজিক চাপ বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে সংসারের দায়িত্ব পালন করতে না পারার ভয়, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাদের চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। একই সঙ্গে তারা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সব মিলিয়ে আত্মহত্যা কোনো একক কারণের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, একাকিত্ব, সম্পর্কের সংকট এবং সামাজিক প্রত্যাশার সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, পারিবারিক সম্পর্কের ভারসাম্য এবং সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি না হলে এই নীরব সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।


